কেইপিজেডে বৈষম্যের প্রতিবাদে শ্রমিক অসন্তোষ,আলোচনায় সমঝোতা

ডেস্ক নিউজ : আনোয়ারায় অবস্থিত কোরিয়ান ইপিজেডে (কেইপিজেড) গত বুধবার থেকে টানা দুদিন ধরে শ্রমিক অসন্তোষ চলছে।বেতন বৈষম্য, লাইন লিডার ও সুপারভাইজারের দুর্ব্যবহার, নৈমিত্তিক ছুটি না দেওয়াসহ নানা বৈষম্যের অভিযোগ এনে শ্রমিকরা গত বুধবার দুপুর থেকে কারখানায় কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। এ অবস্থায় গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আগামি মাসের শ্রমিকদের বেতন বৈষম্যের বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিলে শ্রমিকেরা  কর্মসূচি প্রত্যহার করে নেন। 
সূত্র জানায়, গত বুধবার বেলা একটার দিকে শ্রমিকরা জানুয়ারি মাসের বেতনের পে স্লিপ হাতে পায়।এতে নতুন ঘোষিত সরকারি বেতন স্কেল অনুযায়ি বেতন না পাওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তারা বেতন গ্রহণ না করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। বর্তমানে কেইপিজেডে প্রায় ২১ হাজার শ্রমিক রয়েছে। এখানকার  কর্ণফুলী সু ইন্ডাস্ট্রিজ  (কেএসআই) ইতোমধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম জুতা কারখানা হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। 
এদিকে, গত বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রমিকরা কাজে না ফেরায় সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠকে বসে কেইপিজেডের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় শ্রমিক ও কর্তৃপক্ষের যৌথ বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সকাল ৮টায় শ্রমিকেরা কারখানায় কাজে যোগ না দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। সকাল ৮টা থেকে শ্রমিকেরা কারখানার ভেতরে দফায় দফায় মিছিল সমাবেশ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও শিল্প পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাবও অবস্থান নেয়। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় কর্তৃপক্ষ বিক্ষুব্ধ শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে কয়েক ঘণ্টা বৈঠক করেন। বৈঠকে যৌথ সিদ্ধান্ত হয়, আগামী এক মাস পর শ্রমিকদের সব যৌক্তিক দাবি কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় আনবে এবং বেতন-ভাতার বৈষম্যের বিষয়টিও সমাধান করবেন বলে সিদ্ধান্ত হলে শ্রমিকেরা কর্মসূচি থেকে সরে আসেন। গতকাল কারখানায় কোনো কাজ হয়নি। দুপুর ১১টা থেকে শ্রমিকেরা কাজ ছেড়ে চলে যেতে দেখা গেছে। দুপুর ২টার দিকে কর্তৃপক্ষ কারখানা ছুটি ঘোষণা করে। 
কোরিয়ান ইপিজেডে কর্মরত ক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা জানান, গত ২০১১ সাল থেকে এ প্রতিষ্ঠানের কর্ণফুলী স্যুজ লিমিটেড জুতো তৈরির কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকেরা কাজ শুরু করেন। যোগদানকালীন সময়ে তাদের মূল বেতন, বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসাভাতাসহ সব মিলিয়ে একজন শ্রমিক ৫,১০০ টাকা বেতন পেতেন। ২০১৪ সালের দিকে শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে গেলে এ দফায় বেতন পরিবর্তন হয়ে ৭,২০০ টাকা হয়। 
কিন্তু গত ডিসেম্বর মাসে সরকার ঘোষিত নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে একজন শ্রমিক সব মিলিয়ে ৯,৫০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পাওয়ার কথা। নতুন শ্রমিকদের সাথে পুরাতন শ্রমিকদের মূল বেতনের তেমন পার্থক্য না থাকা এবং যথাযথভাবে ইনক্রিমেন্ট না পাওয়ার অভিযোগ করেন শ্রমিকেরা। এসব অভিযোগ শ্রমিকেরা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলেও সুরাহা হয়নি। উপরন্ত গতকাল বুধবার শ্রমিকদের কাছে জানুয়ারি মাসের বেতনের পে স্লিপ পাঠানো হয়। শ্রমিকেরা পে স্লিপ হাতে পেয়ে বেতন বৈষম্য দূর না হওয়ায় ক্ষুদ্ধ হয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। প্রতিবাদ হিসেবে দুপুর ১ টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করেন তারা।
বেতন বৈষম্য ছাড়াও শ্রমিকদের অভিযোগ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সময়ে লাইন লিডার ও সুপারভাইজারদের দুর্ব্যবহার চরম আকার ধারণ করেছে। এ সব বিষয় দেখার জন্য কর্তৃপক্ষ কাউন্সিলর নিয়োগ করলেও তাদের কাছে অভিযোগ করেও কোনো সুফল পাওয়া যায় না। চাকরি হারানোর ভয়ে কোনো শ্রমিক মুখ খুলতে সাহস করেন না। বিশেষ করে নারী শ্রমিকেরা বেশি হয়রানি হন বলে অভিযোগ রয়েছে।  
এছাড়া শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত ছুটিগুলো তারা ভোগ করতে পারেন না বলে অভিযোগ করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ছুটি না পেয়ে কোনো শ্রমিক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে পরদিন তাকে নাজেহাল হতে হয়। শ্রমিকেরা এ সব বিষয়গুলো অবসান চেয়ে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করেন। 
ঘটনার পর গতকাল বিকেল ৫টায় কেইপিজেডের কারখানার সিনিয়র কর্মকর্তারা উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেন বলে জানা যায় এবং আজ বৃহষ্পতিবার সকাল ৯টায় শ্রমিকদের সাথে তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে যৌথ বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়। 
বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নাজিম উদ্দিন জানায়, নতুন ঘোষিত বেতন স্কেল নিয়ে কেইপিজেডে কর্মরত শ্রমিকেরা অসন্তোষ প্রকাশ করে গত দুদিন কর্মবিরতি পালন করেন। গত বুধবার দুপুর ১টা থেকে আজ দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তারা কারখানার ভেতরে খণ্ড খণ্ড মিছিল করেন। তবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। 
তিনি আরো জানান, ঘটনার পর বন্দর পুলিশ, শিল্প পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাব যৌথভাবে ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। আজ দুপুর ১টায় কারখানার ভেতরে শ্রমিক মালিকের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আগামী মাসে সব ধরনের শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলে শ্রমিকরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। 
কেইপিজেড কর্তপক্ষের বক্তব্য : 
শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ একটি লিখিত অভিযোগ পাঠায়। তাতে উল্লেখ করা হয়, কর্ণফুলী সু ইন্ডাস্টিজ (কেএসআই) কোরিয়ান ইপিজেডের একটি বিদেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের বেতনভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ইপিজেড নির্দেশিকা অনুযায়ী দেওয়া হয়। সরকার ইপিজেডের বাইরের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যে মজুরি কাঠামো সংশোধন করেছে ইপিজেডের ভেতরের কারখানাগুলো এর আওতাভুক্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে কেএসআই-এ বেশিরভাগ শ্রমিকের বেতন নিয়ে সন্তুষ্ট। গুটিকয়েক স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। 
তাছাড়া ছুটি, নারী শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধা, বেতনবৃদ্ধিসহ সকল বিষয়ে কেএসআই ইপিজেডের নির্দেশিকা মেনে চলে। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।
কিউটিভি/রেশমা/৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং/সন্ধ্যা ৬:৪২
শেয়ার করুন